‘বানের জলে ভাসি গেল বাহে হামার সোনার সংসার’

0

আবু সুফিয়ান সম্রাটঃ
“কিচ্ছু থাকিল না আর বাহে; মরার বানের জল হামারগুলার সোগ ভাসে নিয়া গেল। ঘর-দুয়ার, হাড়ি-পাতিল, আবাদ-সাবাদ কিচ্ছু বাদ থোয় নাই। যাবার কোন যাগা নাই বাহে, কাইল থাকি আস্তাত শুতি আছি। এত বিপদত আছি তারপরেও কাইও আইসে নাই।” (আর কিছুই থাকল না ভাই; বন্যার পানি আমাদের সব ভাসায় নিয়ে গেছে। ঘর-দরজা, আসবাবপত্র, ফসল কিছুই বাদ যায় নাই। যাওয়ার কোন জায়গা নাই ভাই, গতকাল থেকে রাস্তায় আছি। এত বিপদ আমাদের তারপরেও কেউ আসে নাই।) দিকভ্রান্ত পথিকের ন্যায় কান্নাবিজরিত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিল কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের হাসনাত সরকার। তার সোনায় বাঁধানো সংসার এক নিমিষেই বন্যার পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। তার ভয়ার্ত চোখগুলো ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে কোন ভাবেই পাশ কাটাতে পারছে না। বন্যার পানির সামনে দাঁড়িয়ে সে হয়ত রোমান্টিক যুগের ইংরেজ কবি এস টি কলরিজ (S T Coleridge) কে রোমন্থন করছে এই বলে “ওয়াটার, ওয়াটার, এভরিহয়ার; নর অ্যানি ড্রপ টু ড্রিম ফর বিল্ডিং এ বেটার ফিউচার।”

বন্যা হোক আর খরাই হোক, প্রকৃতির করাল গ্রাস থেকে উত্তরবঙ্গকে রক্ষার জন্য দেবতাও যেন গড়িমসি করে। তাই প্রকৃতিও সম্ভবত ওঁত পেতে থাকে উত্তরবঙ্গকে নিয়ে ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় মেতে থাকতে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খরা-বন্যার ধারাবাহিক মঞ্চায়ন এ অঞ্চলটির কৃষিভিত্তিক আর্থ-সামাজিক কাঠামোকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। তবে খরা আর বন্যার মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির বিচারে পার্থক্যটা বিস্তর। খরা যখন ফসলের ক্ষতি সাধন করে; বন্যা তখন জীবন-জীবিকা সবকিছু উজাড় করে নিয়ে যায়। এমনি এক বন্যার বুকে দাঁড়িয়ে কাতরাচ্ছে উত্তরের বাংলাদেশ। কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, রংপুর, বগুড়াসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চল আজ এক টুকরো জলসমুদ্রে পরিণত হয়েছে; যেখানে লক্ষ লক্ষ জীবন তাকিয়ে রয়েছে পরিত্রাণ নামক বন্দরের দিকে। কম ভোগান্তি তো আর হচ্ছে না মানুষগুলোর; তারপরেও প্রকৃতি-দেবী যদি তুষ্ট হয়!

এবার প্রকৃতি-দেবী যে শুধু উত্তরবঙ্গের উপর ক্ষেপেছে বিষয়টা তা নয়। চীন, নেপাল, ও ভারত কেউই বাদ যায় নি বন্যার ছোবল থেকে। যা হোক, এবারের বন্যা যে গত ২০০ বছরের বন্যাসংশ্লিষ্ট সকল দুর্যোগকে হার মানাবে তার পূর্বাভাস জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয় (ইউএনআরসিও) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ গবেষণা কেন্দ্র (জেআরসি) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জোর গলায় দাবি করেছে। তাদের দাবি যে বাস্তবতার দিকেই বানের জোয়ার হয়ে এসে উত্তরের নিরীহ, বঞ্চিত, প্রান্তিক, অবহেলিত, সহজ-সরল মানুষগুলোকে নিঃস্ব করে দিয়ে যাবে সেটা অনুমানের অতীত ছিল। উত্তরের সকল জেলাসহ কমপক্ষে ২০টি জেলা এবারের বন্যার জলে একাকার। মাঠ-ঘাট, হাট-বাজার, রাস্তা, জনপদ, স্কুল-কলেজ কিছুই ভূমির উপর নাই। সব কিছুই হয় তলিয়ে গেছে নতুবা দ্বীপের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। পানিবন্দি হয়ে আছে লাখ লাখ মানুষ। সড়ক ও রেল যোগাযোগ একরকম বিচ্ছিন্নই বলা যায়। বিভিন্ন দৈনিক, টিভি চ্যানেল ও স্থানীয় খবর মারফতে দুই দিনে বন্যায় শিশুসহ প্রায় ৩০ জন মানুষ মারা গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছে শতাধিক।

এই বন্যায় সবচেয়ে করুণ ও মানবেতর জীবন পাড়ি দিচ্ছে কুড়িগ্রামের প্রান্তিক দরিদ্র মানুষগুলো। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, খরা, বন্যা, ও শীতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট সহ্য করেও জীবনতরী পার করে এই কুড়িগ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলো। যখন সারাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ত গতি বৃদ্ধি করে এগিয়ে চলেছে তখনও এই কুড়িগ্রাম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে মাত্র। জেলাটি অর্থনৈতিক সক্ষমতার তালিকাতেও একেবারে তলানিতে; মানে জেলা হিসেবে অর্থনীতির আকারে ৬৪ তম। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কুড়িগ্রাম সবসময়ই উপরের সারিতে থাকে তা তো আর নতুন কিছু নয়। খরার সময় ফসলহানি হলে জেলাটিতে মঙ্গা দেখা দেয়। ফলে কুড়িগ্রামের দীর্ঘদিনের একটা ব্র্যান্ডিং ছিল যে, এ অঞ্চলের মানুষজন মঙ্গা অবতারের রোষে দগ্ধ জীবন্ত সৈনিক।

১৬ টি নদ-নদীবিধৌত কুড়িগ্রামে বন্যার বার বার আগমন যেন ‘শ্যাম বিহনে একেলা ক্যামনে রই’ এক দশা; ব্রহ্মপুত্রের চোখ রাঙ্গানি, তিস্তার ঢলের সংবাদহীন আগমন, ধরলার স্রোতের আপোষহীন অভিমান সৈয়দ শামসুল হকের নিভৃত এই জন্মভূমিকে চরম এক রোষানলে ফেলে দিয়েছে। এই বন্যায় সবচেয়ে বেশি ১০ জন মানুষ মারা গেছে এই জনপদটিতে, সবচেয়ে বেশি নিখোঁজ রয়েছে এখন পর্যন্ত এখানেই। জেলাটির ব্রহ্মপুত্রবিধৌত চিলমারী উপজেলাকে জনপদ বলে চেনার কোন উপায় নাই; মাটি-পানি একাকার হয়ে গেছে। উলিপুর উপজেলায় ২ জন বানের জলে ভেসে গিয়ে মারা গেছে; তাদের মধ্যে একজনের নাম বানভাসা, পেশায় কৃষক ছিলেন। তার নাম আর পরিণতিই জানিয়ে দেয় জনপদটির বন্যা দুর্ভাগ্যে আটকে পড়া এক চক্রের কথা। বানভাসার মত সবচেয়ে দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষগুলো এ অঞ্চলের হওয়ায় তাদের কষ্ট ও ভোগান্তিও হচ্ছে বর্ণনাতীত। জেলা ত্রাণ দফতর সূত্র মতে, কুড়িগ্রামের নয় উপজেলার ৫৭টি ইউনিয়নের ৭৬৩টি গ্রাম এখন বানের জলে ভাসছে। ফলে সমগ্র জেলার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে; যাদের মাথাগোঁজার ঠাই ও খাদ্যর পর্যাপ্ত সংস্থান নেই। নদীগুলোর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন তৎপরতা দেখা গেলেও তা অপ্রতুল। বিভিন্ন স্থানীয় সামাজিক সংগঠন বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এবারকার বন্যার ব্যাপক বিস্তার তাদের সামর্থ্যের হাতকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। আবার একটি রেল সেতুর পিলার ভেঙ্গে পড়ায় ঢাকার সাথে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে কুড়িগ্রামের। বন্যা প্রতিরোধে নির্মিত বাঁধ ও সুইচগেটগুলো যেন ট্রয় নগরীর মত ধসে গিয়ে বন্যাকে স্বাগত জানিয়েছে দুর্যোগের গান গাওয়ার।

বন্যা যে উত্তরাঞ্চলে প্রতিবছরেই হয় তা নতুন করে বলার বা জানানোর কিছু নাই। এরপরেও বন্যা মোকাবেলার জন্য দীর্ঘমেয়াদী কোন উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ছে না। দুর্যোগসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কতৃপক্ষ বন্যার সময় ও পরবর্তীতে স্বল্পমেয়াদী কিছু উদ্যোগ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। আবার বন্যা শেষ হয়ে গেলে সরকার, সুধীসমাজ, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যদিকে মনোযোগ দিলে বন্যা সমাধানের বিষয়টি বানের জলের সাথে ভেসে যায়। আর কুড়িগ্রামের মত অবহেলিত জেলার ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি। কারণ মন্ত্রিসভাতে জেলাটির কোন অংশগ্রহণ নেই; নেই সংসদ ও গণমঞ্চেও আমজনতার দাবি তুলে ধরার মতো দক্ষ ও বলিষ্ঠ সাহসী কণ্ঠস্বর। তাই সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে এই ভেঙে পড়া জনপদটির দিকে। ত্রাণ থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে কুড়িগ্রামকে দিতে হবে বিশেষ সুবিধা; যাতে করে জেলাটি বন্যার ছোবল থেকে নিজেকে দাঁড় করিয়ে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের বুনোহাঁসের ঝাঁকের সঙ্গী হতে পারে। শুধু সরকারই নয়, সমগ্র কুড়িগ্রাম জুড়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শান্তিপূর্ণ সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে নিয়মিত জানান দিতে হবে আমাদের ন্যায্য দাবি। সামাজিক সংগঠনগুলোর আরও বলিষ্ঠ হতে হবে গণসচেতনতা ও স্থানীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় বিভিন্ন রসদ ও পদ্ধতি নিয়ে সদা প্রস্তুত থাকার। যা হোক, সময়টা এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বন্যার্তদের সাহায্যে ও উদ্ধারে এগিয়ে আসার; যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে পাশে দাঁড়ানোর। কুড়িগ্রাম তথা সমগ্র উত্তরবঙ্গকে বন্যার হাত থেকে উদ্ধার করে মানবতার হাতে সমর্পণের ডাক দেয়ার এটাই সঠিক সময়; যা ধারণ করবে এই স্লোগান-‘জাগো বাহে, কোনঠে সবাই; চলো বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াই, মানবতার পাশে দাঁড়াই।

আবু সুফিয়ান সম্রাটঃ লেখক, গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্বর্ণপদকজয়ী।

Share.

About Author

Ulipur.com is all about Ulipur Upazilla of Kurigram district. Here we share important information and positive news from Ulipur as well as success stories, inspirational topics and articles from young writers.

Comments are closed.